বিশ্বে ও ভারতে ডায়াবেটিসের ব্যাপকতা: ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যসংকট

SEO শিরোনাম: বিশ্বে ও ভারতে ডায়াবেটিসের প্রকোপ: বর্তমান পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যৎ

Meta Description: বিশ্বে ও ভারতে ডায়াবেটিসের বর্তমান পরিসংখ্যান, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রধান ঝুঁকির কারণ এবং ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণের গুরুত্ব সম্পর্কে জানুন।

প্রস্তাবিত URL Slug: diabetes-prevalence-worldwide-india-bengali

ভূমিকা

ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে ভারতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময় এই রোগকে প্রধানত বয়স্ক মানুষের অসুখ বলে মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমানে মধ্যবয়স্ক ও অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের মধ্যেও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের প্রকোপ বাড়ছে।

ডায়াবেটিস এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যেখানে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। শরীরে ইনসুলিনের অভাব, ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া অথবা উভয় কারণেই এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্‌রোগ, কিডনির অসুখ, চোখের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস এবং স্নায়ুর ক্ষতির মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

তাই বিশ্বে ও ভারতে ডায়াবেটিসের ব্যাপকতা সম্পর্কে জানা, ঝুঁকির কারণগুলি চিহ্নিত করা এবং সময়মতো রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বে ডায়াবেটিসের ব্যাপকতা

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (International Diabetes Federation বা IDF)-এর ২০২৫ সালের Diabetes Atlas, ১১তম সংস্করণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ২০–৭৯ বছর বয়সি আনুমানিক ৫৮৯ মিলিয়ন বা ৫৮ কোটি ৯০ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন।

এই বয়সগোষ্ঠীতে ডায়াবেটিসের আনুমানিক প্রকোপ ছিল ১১.১ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ৯ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে প্রায় ১ জন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন।

IDF-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৮৫৩ মিলিয়নে পৌঁছাতে পারে।

এই বৃদ্ধির পিছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, নগরায়ণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অতিরিক্ত ওজনের মতো একাধিক কারণ রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৮৩০ মিলিয়ন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। WHO-র হিসাব এবং IDF-এর হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, কারণ তাদের তথ্য সংগ্রহের বছর, বয়সসীমা ও পরিমাপের পদ্ধতি এক নয়।

ভারতে ডায়াবেটিসের ব্যাপকতা

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ডায়াবেটিস-আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর দেশ। আমাদের দেশে ডায়াবেটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

IDF Diabetes Atlas 2025 অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে ২০–৭৯ বছর বয়সি আনুমানিক ৮৯.৮ মিলিয়ন বা ৮ কোটি ৯৮ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন।

এই বয়সগোষ্ঠীতে বয়স-সমন্বিত ডায়াবেটিসের প্রকোপ আনুমানিক ১০.৫ শতাংশ।

IDF-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৫৬.৭ মিলিয়নে পৌঁছাতে পারে।

ভারতের ডায়াবেটিস পরিস্থিতি বুঝতে ICMR-INDIAB-এর জাতীয় সমীক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সমীক্ষার ফলাফল ২০২৩ সালে The Lancet Diabetes & Endocrinology পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের শহর এবং গ্রামাঞ্চল থেকে এক লক্ষেরও বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে সমীক্ষাটি জানায়, ২০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিসের আনুমানিক প্রকোপ ছিল ১১.৪ শতাংশ।

এই সমীক্ষার ২০২১ সালের জনসংখ্যাভিত্তিক অনুমান অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ১০১ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। পাশাপাশি প্রায় ১৩৬ মিলিয়ন মানুষের প্রি-ডায়াবেটিস ছিল।

প্রি-ডায়াবেটিস হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, কিন্তু ডায়াবেটিস নির্ণয়ের নির্ধারিত সীমায় এখনও পৌঁছায়নি। এই পর্যায়ে যথাযথ জীবনযাত্রার পরিবর্তন ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

শহর ও গ্রামাঞ্চলে ডায়াবেটিসের প্রকোপ

একসময় মনে করা হতো, ডায়াবেটিস মূলত শহরাঞ্চলের মানুষের রোগ। কিন্তু বর্তমানে গ্রামাঞ্চলেও ডায়াবেটিসের প্রকোপ বাড়ছে।

ICMR-INDIAB সমীক্ষায় শহরাঞ্চলে ডায়াবেটিসের প্রকোপ প্রায় ১৬.৪ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে প্রায় ৮.৯ শতাংশ পাওয়া গিয়েছিল।

শহরাঞ্চলে শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ এবং স্থূলতা এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলেও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, দৈনন্দিন কাজের ধরনে পরিবর্তন এবং শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়ার কারণে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ছে।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলে ডায়াবেটিসের প্রকোপ এক রকম নয়। তাই জাতীয় পরিসংখ্যানের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, রোগ নির্ণয় এবং প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিরও প্রয়োজন রয়েছে।

ডায়াবেটিস বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলি কী?

১. শারীরিক পরিশ্রমের অভাব

দীর্ঘ সময় বসে থাকা, নিয়মিত হাঁটাচলা না করা এবং ব্যায়ামের অভাব শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।

২. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার, মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত পরিমাণে পরিশোধিত শর্করা এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ ওজন বৃদ্ধি ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৩. অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা

বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

৪. বয়স বৃদ্ধি

বয়স বাড়ার সঙ্গে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সাধারণত বৃদ্ধি পায়। তবে যে কোনো বয়সেই এই রোগ দেখা দিতে পারে।

৫. পারিবারিক ইতিহাস

বাবা-মা, ভাইবোন বা নিকট আত্মীয়ের ডায়াবেটিস থাকলে নিজের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

৬. নগরায়ণ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন

আধুনিক জীবনযাত্রা, যানবাহনের উপর নির্ভরতা, কম হাঁটাচলা এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

অনেক মানুষ জানেন না যে তাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বড় বাধা হলো, অনেক মানুষ রোগটি সম্পর্কে জানতেই পারেন না।

IDF-এর ২০২৪ সালের অনুমান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৪৩ শতাংশ জানতেন না যে তাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে।

অনেকের ক্ষেত্রে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। কারও কারও অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, ক্লান্তি অথবা চোখে ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গ হতে পারে।

কিন্তু উপসর্গ না থাকলেও রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে।

তাই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের উপযুক্ত সময়ে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়াবেটিসের প্রাথমিক শনাক্তকরণ কেন জরুরি?

সময়মতো ডায়াবেটিস শনাক্ত হলে রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি কমানোর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ, রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ এবং চোখ, কিডনি, হৃদ্‌যন্ত্র ও পায়ের নিয়মিত পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।

বিশেষ করে যাঁদের বয়স বেশি, ওজন অতিরিক্ত, পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে অথবা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিসের পরীক্ষা করানো উচিত।

ডায়াবেটিসের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ কি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?

বিশ্বে ও ভারতে ডায়াবেটিসের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ উদ্বেগজনক হলেও প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

টাইপ ২ ডায়াবেটিসের অনেক ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার মাধ্যমে রোগের সূচনা প্রতিরোধ করা অথবা বিলম্বিত করা সম্ভব।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো:

  • সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ।
  • নিয়মিত হাঁটাচলা ও শারীরিক ব্যায়াম।
  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা।
  • ধূমপান ও তামাক বর্জন।
  • পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর দৈনন্দিন অভ্যাস গড়ে তোলা।
  • ঝুঁকি অনুযায়ী রক্তে শর্করা পরীক্ষা করানো।
  • ডায়াবেটিস ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ।

ইতিমধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য রক্তে শর্করা, রক্তচাপ এবং রক্তের লিপিড নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়মিত চিকিৎসা ও জটিলতার পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

বিশ্বে ও ভারতে ডায়াবেটিসের ব্যাপকতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। IDF-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ৫৮ কোটি ৯০ লক্ষ এবং ভারতে প্রায় ৮ কোটি ৯৮ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন।

অন্যদিকে, ICMR-INDIAB সমীক্ষা ভারতের ডায়াবেটিস ও প্রি-ডায়াবেটিসের বিশাল বোঝা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছে।

এই পরিসংখ্যান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ডায়াবেটিস কেবল একটি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসমস্যা নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

সচেতনতা, প্রাথমিক শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ডায়াবেটিসের বোঝা কমানো সম্ভব।

আপনার ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকলে উপসর্গ দেখা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে যথাসময়ে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করান এবং সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তুলুন।

তথ্যসূত্র

১. International Diabetes Federation (IDF). IDF Diabetes Atlas, 11th Edition, 2025.

২. World Health Organization (WHO). Diabetes Fact Sheet.

৩. Anjana RM, et al. Metabolic non-communicable disease health report of India: the ICMR-INDIAB national cross-sectional study. The Lancet Diabetes & Endocrinology, 2023.

৪. ICMR-INDIAB Study. ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ডায়াবেটিস ও প্রি-ডায়াবেটিসের প্রকোপ সম্পর্কিত জাতীয় সমীক্ষা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *